ঘটিসাধক

কূহুল মর্ত্যের বিশিষ্ট ঘটিসাধক দরবেশ। দেশ বিদেশে তাহার বিশাল সুনাম, শিষ্যদের কাছে ব্যাপক কদর। সবাই তাহাকে বিশাল জিনিয়াস ভাবিয়া থাকেন। তাহার কালেকশনে রঙ বেরঙ এর ঘটি। বছরের পর বছর সাধনা করিয়া তিনি এত এত ঘটি জমা করিয়াছেন। ঘটি শুধু জোগাড়ই করেন নাই, ঘটিতে সযত্নে তিনি তাহার নামও আকিয়া রাখেন। অনেক সময়ই সবার আগে। যাহাই হৌক। তো দরবেশ বাবার একটা বদ অভ্যাস ছিল। সেটা হইল সুযোগ পাইলেই শিষ্যদের ঘটি নিজের নামে মারিয়া দেয়া। তেমন কেউ অবশ্য বুঝিতে পারে না। বুঝিতে পারিলেও এতবড় দরবেশের বিরুদ্ধাচারণ করিবার সাহস করে না।

তো একবার দরবেশ বাবা তার এক বিরাট নামকরা ঘটি রাখিয়া গিয়াছেন ইয়াহাবিবির উঠানে। যদিও ঘটিখানা তিনি তাহার কতিপয় শিষ্য থাকিয়া জোর করিয়া বাগাইয়া লইয়াছেন। কিন্তু তাহাতে কি! এক যুগ আগের কথা কি কেউ মনে রাখিবে? তো উঠানে ঘটি লইতে আসিয়া তিনি দেখিলেন, যেই ঘটি হইতে তিনি এতকাল দুগ্ধ পান করিয়াছেন, যেই বাগাইয়া লওয়া ঘটি দিয়া তিনি দেশ বিদেশে অনেক নাম কামাইয়াছেন, সেই ঘটিতে তাকে হাত দিতে দেয়া হইতেছে না। ঘটিতে হাতাইতে না পারিয়া তিনি হিংস্র হইয়া উঠিলেন। হিংস্র হইয়া বলিলেন, আমার ঘটির অধিকার চাই! কিন্তু খুব একটা সুবিধা করিতে পারিলেন না।

সুবিধা করিতে না পারিয়া তিনি এক হাটে আসিলেন, আসিয়া তিনি বলিলেন আমাকে আমার ঘটিতে হাতাইতে দিতেছে না, আমি ফ্রাস্ট্রেটেড।

এদিকে নিজের হাতে অনেক কষ্ট করিয়া বানানো ঘটি হারাইয়া তার শিষ্য কষ্ট পাইলেও এতদিন চুপ করিয়া ছিল। হাটে দরবেশকে কান্নাকাটি করতে দেখিয়া সুযোগ বুঝিয়া তার সাবেক শিষ্য পিছন থাকিয়া হাক দিয়া ডাকিয়া উঠিল,

“চুউউউউউর”

ডাক শুনিয়া দরবেশের মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। একে তো ঘটিতে হাত মারিতে না পারিবার বেদনা তাহার উপর হাটে হাড়ি ভাঙ্গিয়া যাওয়ার উপক্রম।

দরবেশ তার স্বভাব বশত হুংকার ছাড়িয়া বলিলেন, ওহে! তোমাকে একদা চাকুরি পাইতে তোমাকে রিকুমেন্ডেট করিয়া দাক্ষিণ্য দেখাইয়া ছিলাম, আর সেই দাক্ষিণ্য ভুলিয়া আমার বিরুদ্ধে এত বড় মিথ্যা অপবাদ!

স্টপ বিচিং, স্টপ হুয়াইনিং, ইউ লুজারস।

এতটুকু ভয় না পাইয়া এবার শিষ্য এবার পাল্টা হুংকার ছাড়িলো, বেটা চুঊর। চুরি করিয়া গলা বড় করিয়া কথা বলিস। তুই কি ভাবিয়াছিস তুই এখনো আমাকে “এফ” দেয়ার ভয় দেখাইতে পারবি? আজকে তোর ঘটি সংক্রান্ত চোট্টামির বৃত্তান্ত বলিয়া তোর সকল হাড়ি আমি এই হাটে ভাঙ্গিয়া গুড়া গুড়া করিয়া দিব। তুমি যতই পিছলাইয়া যাও আজকে তোমাকে আমি ছাই দিয়া পাকড়াও করিয়াছি। ঘটি পাবি, ফেম পাবি কিন্তু সুখ পাবি না শয়তান!

এদিকে হাটে হইচই, গুরু শিষ্যে এহেন বাগ বিতন্ডা দেখিয়া তাহাদের ঘিরিয়া ভীড় জমিয়া গেল। যাহারা ভীর করিল তাহাদের বেশির ভাগই ঘটিসাধনা বা দরবেশের ঘটি চুরির অভ্যাসের সাথে সম্পুর্ণ অজ্ঞ। দরবেশকে আক্রমনের প্রথম সুযোগ দেখিয়া সবজি ব্যবসায়ি ভীমরুলপাসা বলিয়া ঊঠিলেন, “টেগাইয়া দেও! দরবেশের সকল এক্সদের”।

শিষ্য ভীমরুলপাসার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করিয়া একে একে দরবেশের সকল ঘটি বিষয়ক অপকর্ম হাটে সকলের সামনে তুলিয়া ধরিতে শুরু করিলো। সে দাবী করিয়া বসিল একদা ঐ নামকরা ঘটিখানা সেই দরবেশকে বানাইয়া দিয়াছে এবং দরবেশ ঐ ঘটিতে নিজের নাম সবার আগে বসাইবার জন্য জোর জবরদস্তি করিয়াছিল। কিন্তু তাহাতে সফল না হইয়া দরবেশ আস্ত ঘটিখানাই ফাকি দিয়া লইয়া গিয়াছে, এত বছর ঐ ঘটি হইতে সদলবলে দুগ্ধ পান করিয়াছে। এই নামকরা ঘটিখানা যে শিষ্যের বানানো এতকাল তা অস্বীকার যাইয়া শিষ্যকে সকল স্বীকৃতি হইতে বঞ্চিত করিয়াছে।

একে একে নিজের সকল গোমড় এভাবে ফাক হইয়া যাইতে দেখিয়া দরবেশ যাহার পরনাই ভয় পাইয়া গেলেন। তিনি বুঝিলেন, সত্যের বিপক্ষে এমন কোনো অকাট্য যুক্তি তিনি খন্ডাইতে পারিবেন না। স্বভাববশত তৎক্ষণাৎ দরবেশের মাথায় এক দুষ্ট বুদ্ধি খেলিয়া গেল। আম্রিকাতে মুরুক্ষদের আবেগ বেবহার করিয়া টেরাম্প যদি ক্ষমতায় অসীন হইতে পারে, তাহলে এইখানেও সত্য স্বচ্ছ জলের ন্যয় সকলের নিকট পরিষ্কার হইয়া যাইবার আগেই জল ঘোলা করিয়া দিয়া পালাইয়া যাওয়া পসিবল।

তিনি চিৎকার ও আর্তনাদ করিয়া বলিলেন, ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমাকে হেরেস করা হইতেছে। আমি একজন বিশিষ্ট ঘটিসাধক দরবেশ। মুক্ত বাক স্বাধীনতার নামে আমাকে এই হাটে যা ইচ্ছা তাই বলিয়া অপমান তোমরা করিতে পারো না। আমি এই নাক্তেক হাটে আর এক মুহুর্ত অবস্থান করিব না। এই কথা বলিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি হাট হইতে জাতীয় সংসদের বিরুধী দলের ন্যায় ওয়াক আউট করিলেন।

অতঃপর তিনি নিজের উঠানে গিয়া আছাড় খাইয়া পড়িয়া গেলেন, কই মাছের ন্যায় তড়পাইতে তড়পাইতে চিৎকার করিয়া কাদিয়া কাদিয়া কহিতে লাগিলেন,

আমাকে হেরেস করা হইয়াছে।
ইয়াহাবিবি আমাকে হেরেস করিয়াছে, তাহার উঠানে রাখা আমার ঘটির অধিকার কাড়িয়া লইয়াছে।
ঐ নাক্তেক হাট আমাকে হেরেস করিয়াছে, মুক্ত বাক স্বাধীনতার নামে আমাকে হেরেস করিয়াছে, আমি এই হাটের বিচার চাই।
একপাল লুজারস আমার পিছনে লেলাইয়া দিয়া আমার প্রকাশ্য হাটে আমার শ্লীলতাহানি করিয়াছে।

বিশিষ্ট দরবেশের ক্রন্দন শুনিয়া দেশ বিদেশ হইতে লোকজন আসিয়া তার উঠানে উপস্থিত হইতে লাগিল। হাট ফেরত একজন তাহাকে প্রশ্ন করিল, লুজারস পাল হেরেস করিয়াছে না এক / দুইজন লুজার হেরেস করিয়াছে?

দরবেশ ক্ষনিক ক্রন্দন থামাইয়া বলিলেন, নাহ এক পাল, ইট ওয়াজ আ হোল গ্যাং।

যে প্রস্ন করিয়াছিল সে কিঞ্চিত বিশ্মিত হইয়া কহিল, বাকিরা কিভাবে হেরেস করিল?

ক্রন্দন ও গড়াগড়িরত দরবেশ আবার কিঞ্চিত পজ মারিয়া কহিল,
বাকিরা লুজারের কমেন্টে লাইক / লাভ আর আমার কমেন্টে হাহা দিয়াছে!

হাট আর দরবেশের উঠানে ঘটিয়া যাওয়া ঘটনায় উভয় জায়গাতেই অনেক লোক সমাগম হইয়াছে। অজ্ঞ, বিজ্ঞ, সুবিধাবাদী, চাটুকার, নিরুপেক্ষ। ঘটনা যেহেতু একটা ঘটিয়াই গিয়াছে, অতএব বিজ্ঞু মতামত না দিয়া এখন থেকে চলিয়া গেলে কেমন দেখাইবে?

প্রথমে একজন হাক ছাড়িয়া উঠিলেন। যিনি বলিলেন তিনি কখনো ঘটি বানানোর কষ্ট করেন নাই। ঘটি বানাইতে কি পরিমাণ শ্রম দিতে হইতে পারে, সেই বিষয়ে তার কোনো ধারণাই নাই। অন্যের ঘটি জমা দিবার সময় নিজেকে একই টিমে কাজ করিয়াছেন বলিয়া মিথ্যা বলিয়া তিনি বৈতরনী পার হইয়াছিলেন। তিনি বলিলেন সত্য মিথ্যা বুঝি না বুঝিবার দরকার নাই, তবে এহেন আলোচনায় হাটের পরিবেশ নষ্ট হইয়াছে। আমি সত্য মিথ্যা সচেতন না হইলেও পরিবেশবাদী কেননা আমি হাটের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন।

বাকি সবাই মাথা নাড়িয়া সায় দিল। একজন বলিয়া উঠিল, পৃথিবীর এত এত জটিলতা আমি বুঝিতে চাই না, আমি সদা সহজ সরল। একজন দরবেশকে চুর সম্বোধোনের প্রতিবাদ জানাই। আরেকজন উত্তর দিয়া বলিল, কিন্তু দরবেশ যদি আসলেই চুরি করিয়া থাকে?
সে বলিল, আমি আগেই বলিয়াছি জটিল দুনিয়ার এত পেচ আমি বুঝিতে চাই না। দরবেশ চুরি খুন খারাপি যাহাই করুক না কেন, দরবেশ তো দরবেশই, তাহার নামে কিচ্ছু বলিলেই বেয়াদপি হইয়া যাইবে। পাঠ্যপুস্তকে আমি তাহাই শিখিয়াছিলাম। এর বেতিক্রম কিছু আমি ভাবিতে ইচ্ছুক না।

আরেকজন আসিয়া বলিল, আমি দরবেশকে ব্যাক্তিগতভাবে চিনি, এই ধরণের কিছু সে কোনো ভাবেই করিতে পারে না। অতএব, দরবেশের বিরুদ্ধে আনা অভিযুগ সব ভিত্তিহীণ।

স্রোত গা ভাসাইয়া আরো কয়েক গবেট আসিয়া কহিল, সামান্য একটা ঘটি, তাহাও এত বছর আগে সেই ঘটি লইয়া একজন দরবেশকে এত বড় অপবাদ!

শিষ্য প্রতিবাদ করিয়া কহিল, এত বছর হইয়াছে বলিয়া কি চুরির অপরাধ কমিয়া গিয়াছে?

গবেট গবেটের মতই কহিল, ভাই আপনি আরো বড় ঘটি বানাইবেন। এত ছোট একটা বিষয় নিয়া কেন হাউ কাউ করিতেছেন?

শিষ্য চেতিয়া গিয়া কহিল, বেটা! দরবেশের মত একজন সুযোগ পাইলেই ঘটি চুরি করে সেইটা তোর কাছে ছোট জিনিস মনে হইল?
গবেট গবেটের মত আবারো কহিল, ভাই গুরু শিষ্যে ভালুবাসাটাই আসল, আর সব কিছু নগন্য

এসব আলোচনা শুনিয়া দরবেশের মুরিদ সম্প্রদায় লাই পাইয়া গেল। তাহারা ভাবিয়া দেখিল, শিষ্যের সাথে কি হইয়াছে আর না হইয়াছে তাহা দিয়া কি হইবে? দরবেশ কে একটু হাওয়া দিতে পারিলে যদি কিছু সুবিধা আদায় করা যায়।

বিশিষ্ট সুবিধাবাদী এক চাটুকার ছয় ফাল দিয়া আসিয়া কহিল, আমার ঘটিতে আমি সেচ্ছায় দরবেশের নাম আগে বসাইয়াছি। আমার ঘটি লইয়া টানাটানি করিয়া আমাদের দরবেশ কে অপমান করিবার চেষ্টাও করিবেন না।

আরেকজন সুবিধাবাদী আসিয়া কহিল, একজন দরবেশের বিপক্ষে এত বড় ক্রেডিট চুরির এলিগেশন, তাও পাব্লিক প্লেসে? কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না

সবাই গো গো করিতে লাগিল, এই গুঞ্জনের ভেতর কিছু কিছু শব্দ জোরে জোরে শোনা যাইতে লাগিল “বেয়াদপ”, “আদব কায়দা নাই”, “এত বড় অপবাদ”, “বিশ্বাস করি না”।

নিজের উঠান থেকে দরবেশ তার বৌয়ের মারফত হাটের খবর জানিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন, তাহার কুট কৌশল কাজে লাগিয়াছে। হাটের পরিবেশ পদ্মার জলের মতই ঘোলা হইয়া গিয়াছে। এই ঘোলা পানিতে তাহার চৌর্যবৃত্তির ঘটনা অচিরেই আবারো আগের মত চিরুতরে ধামাচাপা পড়িয়া যাইবে।

ইতিমধ্যে দরবেশের বৌ কান্নাকাটিতে যোগ প্রদান করিয়া নাটকে নতুন মাত্রা যোগদান করিল। সে দাবি করিল, দরবেশের বিরুদ্ধে এইরূপ অভিযোগে তাহার পারিবারিক জীবন ব্যহত হইতেছে। সে তাহার বাচ্চাকে ঠিকমত খাওয়াইতেও পারিতেছে না।

সুযোগ দেখিয়া দরবেশের বিশিষ্ট এরুগান্ট বন্ধু দরবেশ হাটে আসিয়া উপস্থিত হইল, সে বলিল এইরূপ মিথ্যা অপবাদে একটা দরবেশ ফেমিলির জীবন চিরুকালের জন্য ধ্বংস প্রাপ্ত হইয়াছে। এইরূপ ফেমিলি ধ্বংস করিবার জন্য দায়ী বেক্তিদের আমরা কিরূপে বিচার বা শাস্তি দিতে পারি?

ঘটনা পক্ষে যাইতেছে দেখিয়া, কূহুল দরবেশের কান্নাকাটি বহুগুনে বাড়িয়া গেল। সে ঊঠানে গড়াগড়ি খাইতে খাইতে বলিতে লাগিল,

ইয়াহাবিবি থেকে আর কোনো শিষ্য আমি রাখিব না। ইয়াহাবিবির ঘটিও আমার লাগিবে না। আর ওই হাটের আমি নিকুচি করি। ওই হাটে আমি আর কক্ষনোই যাইব না। হেরেস করে আমার মত দরবেশকে?!!

আমি ইয়াহাবিবিকে তের কুটি টাকা ফান্ডিং পাওয়াইয়া দিয়াছি। আমার চেয়ে বড় মুইকিহনু তারা কিভাবে পায় আমি দেখিয়া লইব!

হটাৎ তার ইয়াহিবির দেয়া উপহারের সোনার মেডেলের কথা মনে পড়িয়া গেল। তারপর তিনি চিতকুর করিয়া কহিলেন,

লইয়া যাও আমার সোনা।

আমার কোনো সোনার দরকার নাই।

এই গল্পের সমস্ত ঘটনা ও নাম কাল্পনিক, বাস্তবের কোনো কিছুর সাথে মিল পাওয়া গেলে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *